কলবাড়ি হাট তখন জমজমাট ছিল না। মজুমদার হাট কেন্দ্রিক ছিল আমাদের গ্রাম্য জীবন। প্রত্যেক রবি আর বিষ্যুদবার হাট মিলতো। সাথে সাথে মিলতো শিবু যোগীর থেকে কড়া রং দেওয়া চালতার আচার কিনে খাওয়ার সুখ। কিন্তু এক দেড় মাসে এক-দুইবার আমার আসতো দুঃখ।
এই দুঃখ চুল কাটাইতে গিয়া অপমান-অপদস্ত হওয়ার দুঃখ। ওয়াপদার রাস্তার পরে নদীর আগে উঁচু মাঠে হাট বসতো। সেখানে একপাশে ক্ষুর-কেচি নিয়ে বসতো বয়স্ক এক নাপিত। নাম মনে নাই। আমারে একটা ইটের ওপর বসাইতো, আর নাপিত বসতো দুইটা ইটের ওপর। বড় সমস্যা সেটা না। চুল কাটানোর সময় নাপিত আমার ঘাড়ের পুরা কন্ট্রোল নিতে চাইতো; আর আমি চাইতাম ঘাড় ঘুরাইয়া বড় বড় চোখ করে হাটের মানুষজন-কেনাবেচা দেখতে। তো, বয়স্ক নাপিত জোড়ে জোড়ে চাপ দিয়া মাথাসহ ঘাড় কন্ট্রোলের চেষ্টা করতেন, এক পর্যায়ে তিনি জিতে যাইতেন। বড় সমস্যা সেটাও না। চুল কাটতে গিয়া নাপিত আমার মাথারে তার হাটুর সাথে চাইপা ধরতেন। সেটাও বড় সমস্যা ছিল না।
বড় সমস্যা ছিল, বয়স্ক নাপিত তার হাটুর সাথে যেখানটায় আমার মাথা চাইপা ধরতেন, সেই জায়গায় কাপড় থাকতো না। তিনি এমনভাবে ধুতি পড়তেন, তার দুই হাটু উদাম হয়ে থাকতো। কি এক অবস্থা, ছোট মানুষ বইলা কি আমার মান-সম্মান নাই? খুব দুঃখ পাইতাম। অপমান লাগতো।
আরেকটু বড় হইয়া আমি আর সেই বয়স্ক নাপিতের কাছে চুল কাটাইতাম না। রাস্তার ওপরে খড়ের চাল আর বাঁশের বেড়া দেওয়া ছোট ছোট দুই রুমের একটা ঘর ছিল। একপাশে টেইলার্স চালাইতেন রমেশ। (মজুমদার হাটের সব বিলুপ্ত হয়ে গেলেও এখনো রমেশ আছেন কালের সাক্ষী হয়ে।) আর পাশের রুমে বসতেন তার ভাই পরেশ।
পরেশ দাদা মূলত পটুয়াখালী থাকতেন। সেইখানে তার সেলুন আছে। শুধু বিষ্যুদবারে আসতেন। সাড়ে বারোটার লঞ্চে করে সোয়া একটার দিকে নামতেন। কাপড়ের ব্যাগে ক্ষুর-কেচিসহ জিনিসপত্র থাকতো। আবার হাটবার দিন কাজ শেষ করে সন্ধ্যার লঞ্চে ফিরে যাইতেন।
পরেশ দাদা আমারে খুব আদর করতেন। আমার জন্য কাঠের চেয়ারের হাতলের ওপর তক্তা দিয়া আরো উচা জায়গায় বসার ব্যবস্থা করতেন। আমার আরাম লাগতো। এমনিতে আমার চুলে সবসময় ভদ্রগোছের ছাট দিতাম। কিন্তু বাম কানের উপর দিয়া মাথার চুলে একটু প্যাচ আছে। এইটা পরেশ দাদা ধরতে পারতেন। সুন্দর কইরা কাইটা মিশাইয়া দিতেন।
তার দোকানে ভালো ভিড় হইতো। এইজন্য আমি মাঝে মাঝে সোয়া একটার আগেই হাটে যাইয়া লঞ্চ ঘাটে অপেক্ষা করতাম। পরেশ দাদা লঞ্চ থেকে নাইমা আমারে দেইখা সুন্দর হাসি দিতেন। কইতেন, ‘সিকদার আজকে আমার প্রথম কাস্টমার। আজকে আমার ব্যবসা লক্ষী’।
তো এরপর জীবনে বহু সেলুনে আমি চুল কাটাইছি। সেই আরাম পাই নাই। এখনো সেলুনে গিয়া আয়নায় তাকাইলে মাঝে মাঝে কাঠের চেয়ারের হাতলের তক্তার ওপরে বসা ছোটবেলার ছবি দেখি। আর রমেশের সেলাই মেশিনের আওয়াজ পাই।
